শ্রীশ্রী মা সারদাদেবী ১৮৫৩ সালে জয়রামবাটী নামক একটি গ্রামে (বাঁকুড়া জেলা) কৃষ্ণা সপ্তমী তিথিতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও মাতা শ্যামাসুন্দরী দেবী।
বিভিন্ন পুস্তক পড়ে শ্রীমায়ের অনেক অলৌকিক চরিত্র সম্বন্ধে জানা যায়, যা 'মা'-কে অতিমানব পর্যায়ের বলে মনে হয়। শ্রীমায়ের মাতা শ্যামাসুন্দরী দেবীর জীবনের একটি ঘটনা:
স্বামী কাজের জন্য শিহরে গেছেন। শ্যামাসুন্দরী দেবী বাপের বাড়ি একা ছিলেন। জয়রামবাটীর কাছে শিহরে এই বাপের বাড়ি ছিল তাঁর। একদিন অন্যান্য গ্রাম্যবধূদের সাথে পুকুরপাড়ে গেছেন তিনি। একটু অসুস্থ ছিলেন সেই সময়। প্রায় সংজ্ঞাহীন অবস্থায় কুমোরদের গানের শব্দে হঠাৎ সচকিত হয়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখলেন যে একটি রক্তবস্ত্র পরিহিতা অপরূপা বালিকা তাঁকে বলছেন: "আমি তোমার ঘরে এলাম মা।" তারপর তিনি শ্যামসুন্দরী দেবীকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি পুনরায় সংজ্ঞাহীন হলেন। জ্ঞান ফিরলে অনুভব করলেন ওই বাচ্চা মেয়েটি তাঁর গর্ভে প্রবেশ করেছে। এভাবেই মা সারদার আগমন।

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব ও সারদাদেবীর বিবাহটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল কোনো দৈব প্রেরণায়। শিহরে কোনো এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গদাধর একদা উপস্থিত হয়েছিলেন। শিশু সারদা দূরে এক মহিলার কোলে ছিলেন। গান শেষ হলে ওই মহিলা শিশু সারদার সাথে একটু মজা করেন, বলেন - "এই যে এত লোক এখানে আছে, কাকে তোর বিয়ে করতে ইচ্ছে হয়।" শিশু সারদা অমনি হাত তুলে শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখিয়ে দেন। একদা ঈশ্বর-পাগল শ্রীরামকৃষ্ণদেবের মাতা চন্দ্রমণি রামকৃষ্ণদেবের বিবাহ দেবেন বলে পাত্রী খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়েছিলেন। কোথাও পাত্রী পেলেন না। গদাধর ব্যাপারটি জানতে পেরে বললেন: "এদিক ওদিক দিয়ে কি হবে? ওই জয়রামবাটি গিয়ে দেখো বিয়ের কনে 'কুটো বাঁধা' আছে।" তখনকার দিনে কন্যাপণের প্রচলন ছিল। তাই সেই সময় পাত্রী পছন্দের সাথে সাথেই পাত্রপক্ষ কন্যাপক্ষকে ৩০০ টাকা পণ দিলেন। ২৪ বছরে গদাধর-এর সঙ্গে ছয় বছরের সারদামনির বিয়ে হয়ে গেল।
মা সারদা নিরক্ষর ও গ্রাম্য বালিকা হলেও তিনি ছিলেন অসীম জ্ঞানের অধিকারিনী। স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে যখন আমেরিকায় ছিলেন তখন একজন সন্ন্যাসী গুরুভ্রাতাকে লিখেছিলেন - "মা ঠাকুরণ কি বস্তু বুঝতে পারোনি, এখনও কেউ পারোনি - ক্রমে পারবে। শক্তি বিনা জগতের উদ্ধার হবে না। মা ঠাকুরের ভারতে পুনরায় সেই মহাশক্তি জাগাতে এসেছেন, তাঁকে অবলম্বন করে আবার সব - গার্গী, মৈত্রী জন্মাবে।"

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, মা সারদাকে প্রশ্ন করেছিলেন, "তুমি কি আমাকে সংসারে টেনে নিতে এসেছ?" মা সারদা জীবনে প্রথম প্রভাতে একান্ত তরুণ বয়সে উত্তর দিলেন, "না সাধনায় সহায় হতে এসেছি।" তাই ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব একদা বলেছিলেন - "ও যদি এত ভালো না হতো তাহলে সংসারের বাঁধ ভেঙে দেহ বুদ্ধি আসতো কিনা কে জানে?"
ছোটবেলা থেকেই মা ছিলেন দয়ার মূর্তি। যেমনটি ছিলেন তাঁর পিতা রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। ১৮৬৪-৬৫ সালে বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে মানুষের অন্য কষ্ট দেখা দেয়, যা চোখে দেখা যায় না। সেই সময়ে রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায় তাঁর মরায় ভর্তি ধান দিয়ে চাল করে প্রতিদিন খিচুড়ি রাঁধতেন আর ক্ষুধার্ত মানুষদের খাওয়াতেন। এত গরম কিন্তু তাদের সহ্য হতো না। এদিকে ছোট্ট সারদা এইসব দেখে ছোট দু'হাত দিয়ে হাওয়া করতেন।
সবারই মা ছিলেন সারদাদেবী। তিনি বলতেন - "আমি সতেরও মা, অসতেরও মা, সতীরও মা, অসতীরও মা।" তিনি কোনোরকম ভেদাভেদ পছন্দ করতেন না। জয়রামবাটি এলাকার মুসলমান ডাকাত আমজাদকে সন্তানস্নেহে নিজের কাছে ডেকে নিয়েছিলেন। মুসলমান মজুরের এঁটো নিজের হাতে নির্দ্বিধায় পরিষ্কার করতেন। তিনি বলেছিলেন, "ছেলের এঁটো পরিষ্কার করলে কখনো জাত যায় না।" পাপী-তাপী, সৎ-অসৎ, জাতি-ধর্ম সবই সমান ছিল তাঁর বিচারে। তিনি বলতেন - "সন্তানের আবার ভেদাভেদ কি?"
স্বামী বিবেকানন্দ শ্রীমাকে 'জ্যান্ত দুর্গা' বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। একবার বাবুরাম মহারাজের মা দুর্গা পূজা করবেন শুনে স্বামীজি লিখেছিলেন - "বাবুরাম মহারাজের মা'র কি ভীমরতি হয়েছে? 'জ্যান্ত দূর্গা' বাদ দিয়ে মাটির প্রতিমা পূজা করতে যাচ্ছেন।" তিনি যে জগৎ জননী ছিলেন তা আমরা তাঁর জীবনী পাঠ করে জানতে পারি।
একবার ঠাকুর মহা ধুমধামে পূজার আয়োজন করলেন। শ্রীমা তখন জয়রামবাটিতে। গিরিশ শ্রীমাকে দুর্গাপূজায় উপস্থিত থাকতে আমন্ত্রণ করলেন। মা কি করে গিরিশের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন।


তিনি কলকাতায় চলে এসে বলরাম বসুর বাড়িতে উঠলেন। কিন্তু মহাঅষ্টমীর সন্ধিপূজার আগে মায়ের জ্বর এসে গেল। এদিকে মায়ের জ্বর শুনে গিরিশ ঘোষ মহা চিন্তায় পড়ে গেলেন। আর বলতে লাগলেন: "আমি তো মাটির প্রতিমা উপলক্ষে শ্রীমায়ের পূজা করছি। সন্ধিপূজা তো গভীর রাতে অনুষ্ঠিত হবে।" ওদিকে মা ধড়ফড় করে উঠে পাশের গলিতে গিয়ে গিরিশ ঘোষের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলেন। শ্রীমাকে দেখে গিরিশের আনন্দের সীমা রইল না। বলে উঠলেন "জয় মা, জয় মা"।



চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।
