ভারতের জাদু ও জাদুকরেরা

রয় দ্য মিস্টিক (১৮৯১-১৯৭৭)
জাদুকর যতীন্দ্রনাথ রায়। জন্ম: ঢাকা, তৎকালীন পূর্ববঙ্গ। পিতা: শ্রী কালীভৈরব রায়। ধামরাইয়ের এক জমিদার এস্টেটের সঙ্গে কাজ করতেন।
রয় দ্য মিস্টিকের একটি বিখ্যাত পঙ্ক্তি -
"জাদুকর! কী খেলা যে দেখাও তুমি - অবাক হয়ে যাই,
বিশ্বরঙ্গের মাঝে বসে রঙ দেখাও ছদ্মবেশে।"
১৯০৭ সালে ঢাকায় তৎকালীন বিখ্যাত জাদুকর এমিন সুরাবর্দির খেলা দেখে রয় দ্য মিস্টিক গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। সেই মুহূর্ত থেকেই ভাবেন যে তিনিও হবেন একজন জাদুকর। একদিন সাহস করে উপস্থিতও হন এমিন সুরাবর্দির কাছে। কিন্তু বহু অনুরোধ সত্ত্বেও সরাসরি শিক্ষা মেলেনি তার। তবু দমে যাননি তিনি। অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায়ই হয়ে ওঠে তাঁর মূল শক্তি।
পরবর্তীতে ঢাকা মাদ্রাসার শিক্ষক মির্জা আখতার আলি খাঁ সাহেবের সহায়তা পান তিনি। জাদুবিদ্যায় পারদর্শী না হয়েও মির্জা সাহেব তাঁকে প্রবেশের পথ দেখান। তাঁর হাতেই তুলে দেন প্রোফেসর হফম্যানের বিখ্যাত জাদু গ্রন্থ 'Modern Magic'। সেই বই-ই হয়ে ওঠে যতীন্দ্রনাথ রায় এর প্রথম গুরু। নিয়মিত অনুশীলন, গভীর অধ্যয়ন এবং নিরলস সাধনার মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে গড়ে তোলেন একজন দক্ষ ও সৃজনশীল জাদুশিল্পী হিসেবে।
বড় কোনও গুরুর সরাসরি শিষ্যত্ব না পেলেও আত্মশিক্ষা ও কঠোর পরিশ্রমের জোরেই যতীন্দ্রনাথ 'রয় দ্য মিস্টিক' হয়ে ওঠেন। তার জাদুতে ছিল সাবলীল উপস্থাপনা ও দর্শকের সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ যোগাযোগের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।
পিসেমশাই নগেন্দ্রনাথ নন্দী ছিলেন যতীন্দ্রনাথের অনুপ্রেরণা। তিনি বড় জাদুকর না হলেও শুরু থেকেই উদ্যম ও উৎসাহ জুগিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি স্বরক্ষেপণ (ভেন্ট্রিলোকুইজম) শিখেছিলেন কেবল বই পড়েই। রবার্ট গ্যানথোনির 'Ventriloquism' গ্রন্থ থেকেই তাঁর এই বিদ্যার প্রাথমিক শিক্ষা।
পড়াশোনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। ইংরেজি ভাষায় দখল, স্পষ্ট উচ্চারণ, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা - সব মিলিয়ে চাকরি পেতে অসুবিধা হয়নি তাঁর। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার সেটেলমেন্ট অফিসে সরকারি চাকরিও পান। কিন্তু সেই বাঁধাধরা জীবন তাঁকে টানতে পারেনি। স্বাধীন সত্তার টানে ১৯১১ সালে ছেড়ে দেন সরকারি চাকরি। স্থির করেন, এবার সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করবেন জাদুশিল্পেই।
ঢাকা শহরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে তাঁর বিশেষ বেগ পেতে হয়নি। অসাধারণ দক্ষতা ও অভিনব উপস্থাপনার জোরে দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। অনেক দর্শকই তাঁর খেলা দেখে তাঁকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী বলে মনে করতেন। তাঁর পরিবেশনার তালিকায় ছিল মাল্টিপ্লাইং বিলিয়ার্ড বল, চাইনিজ লিংকিং রিং, মেন্টাল টেলিপ্যাথি, থট রিডিং, ফ্লোটিং বল, বার্ড ইন দ্য মিড-এয়ার প্রভৃতি চমকপ্রদ খেলা।
তবে জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে জীবনে এসেছে নানা রোমাঞ্চ ও বিপদের মুহূর্তও। এমনই একটি ঘটনা - একবার জাদুর সরঞ্জাম নিয়ে তিনি পৌঁছেছিলেন বুন্দেল শহরে। ভ্রমণের পাশাপাশি সেখানেও খেলা দেখিয়ে সাড়া ফেলাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। কিন্তু শহরটি তখনকার পরিচিত জনবহুল নগরীর মতো ছিল না; অনেকটাই ফাঁকা, গ্রামের মতো শান্ত পরিবেশ। সেখানে অবস্থানকালে দুপুরবেলায় তিনি প্রায়ই নির্জন মাঠের দিকে হাঁটতে যেতেন। গাছের ছায়ায় একান্তে বসে চলত ভেন্ট্রিলোকুইজমের অনুশীলন - নিজের সঙ্গে নিজের এক নিরন্তর লড়াই, দক্ষতাকে আরও শাণিত করার প্রয়াস। সেই সময় তাঁর সঙ্গী ছিল দুটি কাঠের পুতুল - একটির নাম জ্যাক, অন্যটির কাকা। তাদের সঙ্গে মজার সংলাপ আর হাস্যরসাত্মক কথোপকথনের মধ্য দিয়েই তিনি দর্শকদের মোহিত করতেন, আনন্দ দিতেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে রটতে শুরু করল - যতীন্দ্রনাথের নাকি অলৌকিক ক্ষমতা আছে! তিনি নাকি ভূতের সঙ্গেও কথা বলতে পারেন। গ্রামের মানুষ অনেকেই দেখেছেন, নির্জন মাঠে গাছতলায় বসে তিনি পুতুলের সঙ্গে কথা বলছেন। সেই দৃশ্যই ধীরে ধীরে গুজবে রূপ নিল - কাঠের পুতুলে নাকি ভর করেছে কোনো অদৃশ্য আত্মা! মুখে মুখে এসব গল্প ছড়িয়ে পড়ল গোটা এলাকায়।
এই সময় পাশের গ্রামের এক কিশোর হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে মারা যায়। প্রথমে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, পরে হাসপাতালে - কিন্তু কোনোভাবেই তার প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। মৃত্যুর দু'দিন পর হঠাৎই কারও মুখে শোনা গেল, "মাস্টারবাবু তো ভূতের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, তিনি নিশ্চয়ই ছেলেটিকে ফিরিয়ে দিতে পারবেন!" অচিরেই সেই গুজব আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামবাসীরা দল বেঁধে এসে ধরল তাঁকে - প্রাণ ফিরিয়ে দিতেই হবে! পরিস্থিতি যে ভয়াবহ দিকে মোড় নিতে পারে, তা তিনি মুহূর্তেই বুঝতে পারলেন। সরাসরি অস্বীকার করলে বিপদ বাড়বে, আবার সম্মত হলেও অসম্ভব কাজের দায় এসে পড়বে তাঁর কাঁধে। ঠিক তখনই বুদ্ধির আশ্রয় নিলেন তিনি। নিজের অভিনয়-কৌশলকে হাতিয়ার করে পুতুল 'জ্যাক' ও 'কাকা'-কে সামনে নিয়ে যেন ভূতের সঙ্গে কথোপকথন শুরু করলেন কিছুক্ষণ নাটকীয় সংলাপের পর গম্ভীর স্বরে জানালেন, "এ যে দু'দিনের পুরনো মৃতদেহ। যথাযথ সৎকার না হলে তার আত্মা শান্তি পাবে না। আগে সৎকার সম্পন্ন করো।"
গ্রামবাসীরা হতভম্ব। অনেকে তর্ক করলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর কথাই মেনে নিল। পরিস্থিতি সাময়িকভাবে সামলে গেল। কিন্তু তিনি বুঝেছিলেন, এখানে আর থাকা নিরাপদ নয়। মানুষের অন্ধবিশ্বাস কখন যে হিংসায় রূপ নেয়, বলা যায় না। তাই পরদিনই নীরবে সরে পড়েন সেই অঞ্চল থেকে।
ঘুরে ঘুরে পালিয়ে বেড়ানো যেন একসময় তাঁর জীবনেরই অংশ হয়ে উঠেছিল। শুধু শখের ভ্রমণ নয়, জীবন বাঁচাতেও দীর্ঘদিন তাঁকে আত্মগোপন করে থাকতে হয়েছে। তখন দেশজুড়ে উত্তাল সময় - ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। শাসকশক্তি কঠোর হাতে দমননীতি চালাচ্ছে, সন্দেহভাজনদের উপর নেমে আসছে নির্যাতন। এমন পরিস্থিতিতেই তিনি ছিলেন অনুশীলন সমিতির সদস্য এবং ব্রিটিশদের চোখে 'প্রতাপশালী শিকার'। ফলে বিপদ ছিল নিত্যসঙ্গী।
১৯৩০-এ চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল আন্দোলনের সময়ও তাঁর নাম জড়িয়ে পড়ে ঘটনাপ্রবাহে। লুণ্ঠনের পর পুলিশি তৎপরতা বাড়তেই ময়মনসিংহ ছেড়ে তাঁকে পালিয়ে আসতে হয় ঢাকায়। এদিকে ব্রিটিশ পুলিশ তখন সর্বত্র তাঁকে খুঁজছে। কিছুদিন বাধ্য হয়ে জাদুর আসর বন্ধ রাখলেন। কিন্তু শিল্পীর মন কি থেমে থাকে? জীবিকার তাগিদে শুরু করলেন কাপড়ের ব্যবসা - হকারি করে বিক্রি করতেন বিদেশি কাপড়ের শাড়ি।
পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হতেই তিনি আবার ফিরে এলেন নিজের আসল মঞ্চে। নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করলেন - 'রয় দ্য মিস্টিক'। গড়ে তুললেন নতুন দল। এক নেপালি তরুণ ছিল তাঁর সর্বক্ষণিক সহচর/সহকারী।

এই নতুন অধ্যায়ে তিনি যেন আরও দৃঢ়, আরও পরিণত। প্রতিকূলতা তাঁকে থামাতে পারেনি, বরং প্রতিটি আঘাত তাঁকে আরও শাণিত করেছে।
ঢাকাতেও বেশিদিন থাকা সম্ভব হয়নি তাঁর পক্ষে। পরিস্থিতির চাপে তাঁকে সেখান থেকেও সরে যেতে হয়। পরে তিনি দার্জিলিংয়ে গিয়ে একটি চা-বাগানে কাজ নেন। কাজের ফাঁকে চা-বাগান ও আশপাশের স্টেশন এলাকায় ছোট ছোট ম্যাজিক শো করে মানুষকে আনন্দ দিতেন।
এরই মধ্যে ইতিহাসের এক বড় পরিবর্তন ঘটে - দেশভাগ। স্বাধীনতার পর নতুন ভোরের আলোয় দেশ জেগে ওঠে। সেই সময় খদ্দরের ধুতি-পাঞ্জাবি পরে আবারও মঞ্চে উঠে দাঁড়ান তিনি। তাঁর অসাধারণ জাদুতে মুগ্ধ হয়েছিলেন অনেকেই। স্বাধীন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের প্রথম রাজ্যপাল ডা. কৈলাশনাথ কাটজুর সামনে নিজের ম্যাজিক প্রদর্শন করে বিশেষ সুনাম অর্জন করেন জাদুশিল্পী রয় দ্য মিস্টিক।

শুধু জাদু দেখানোতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না তিনি। জাদুর পাশাপাশি তিনি রচনা করেছিলেন বহু গানও। তাঁর সৃষ্ট গানগুলির অধিকাংশের সুর ছিল ভাটিয়ালি ধারার। হস্তরেখা বিশারদ হিসেবেও তাঁর যথেষ্ট সুনাম হয়েছিল।
জীবনের শেষ পর্বে এই জাদুকর কলকাতায় চলে আসেন। তিনি বসবাস করতেন কলকাতার গলফগ্রিন অঞ্চলে, তাঁর ছেলের (অতিন রায়) তৈরি করা বাড়িতে। সেখানেই ১৯৭৭ সালের ২৩ জানুয়ারি তিনি পরলোকগমন করেন।
তাঁর মৃত্যুর এত বছর পরেও তাঁর জীবনের নানা রহস্য আজও মানুষের মনে বিস্ময় জাগায়।
(ক্রমশ)
চিত্রঋণঃ শৈলেশ্বর মুখোপাধ্যায়
ও অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।
