বিবিধ

খাল-বিলের আখ্যান (দ্বিতীয় খণ্ড - ত্রয়োদশ পর্ব) [ধারাবাহিক]



মমতা বিশ্বাস


২রা ফেব্রুয়ারি বিশ্ব জলাভূমি দিবস উপলক্ষে কৃষ্ণগঞ্জ বিডিও অফিসে একটা সেমিনারে সম্পদকে প্রধান বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। উদ্দেশ্য, এই বিডিও অফিসের অধীন পঞ্চায়েত প্রধান, মেম্বার ও অঙ্গনওয়ারী কর্মীদের 'জলাভূমি সংরক্ষণের গুরুত্ব ও সচেতনতা' বৃদ্ধি। খাল-বিল, নদী-নালার সঙ্গে যাদের নাড়ির যোগ, তারাই গুরুত্ব বেশি অনুভব করতে পারে। এসেছিলেন এডিও সাহেব। আসলে, প্রত্যক্ষভাবে জড়িত মানুষেরাই তো নদী, খাল-বিলের মর্ম বোঝে। আজকাল সেমিনারে গিয়ে সম্পদের আর বক্তব্য রাখতে ইচ্ছে করে না, তবুও যেতে হয়েছিল। বলতেও হয়েছিল। বলতে হয় সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের কথা। সাধারণ মানুষের দায়-দায়িত্বের কথা, নিজের বাস্তব উপলব্ধির কথা। আশার কথা। খাল-বিল তীরবর্তী মানুষ কতটা উপকৃত হবে তার কথা। খাল-বিলের অস্তিত্বের উপর পরোক্ষভাবে যাদের যাপন নিয়ন্ত্রিত হয় তাদের দায় ও কম নয়; সে কথা। বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বিনষ্ট হলে পরিবেশের যে ক্ষতি হয়; সে বিষয়টিও। অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার প্রভাবে জনজীবন কীভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, সে বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে।

বক্তব্য রাখার পর তার মনে হয় মানুষকে শুধু বড় বড় কথা শোনানো হলো। আর শেষে হাততালি কুড়ানো; যদিও হাততালির সংখ্যাও দিন দিন কমে আসছে। বঙ্গের মানুষ বুঝে গেছে যতই সেমিনার হোক, যতই পরিবেশ সচেতনতার কথা বলা হোক, আসলে মুমূর্ষু নদীকে তার পূর্ব রূপে ফিরিয়ে নিয়ে আসা কোনভাবেই সম্ভব নয়। মানুষ জ্ঞান পাপী; শোনে, বোঝে, অথচ মানে না। মনে মনে মানে; কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে বিরুদ্ধাচরণ করে। প্লাস্টিকের ব্যবহার পরিবেশকে ভয়ঙ্করভাবে দূষিত করে, একথা মানুষের অজানা নয়; তবুও বাজার থেকে প্রতিনিয়ত পাঁচ-সাতটা ক্যারিপ্যাকেট বাড়িতে নিয়ে আসছে। মাছ-মাংসের দোকান থেকে পারলে ২/৩ চেয়ে নেয়। সচেতন দোকানদারও খরিদ্দার ঠেকাতে ক্যারিপ্যাকেট দিতে দ্বিধাবোধ করে না। খরিদার তাদের লক্ষ্মী! তুষ্ট রাখতেই হবে। জিনিসপত্র বাড়িতে পৌঁছানোর পর ক্যারিপ্যাকেট জমা হচ্ছে নালা নর্দমা খাল-বিল নদী ও সমুদ্রে। প্লাস্টিকের ব্যবহারের জন্যই মানুষ মারণ রোগ, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট ও ত্বকের সমস্যাসহ আরো নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিল-বাউড়, খাল কোনোদিনই আগের রূপ ফিরে পাবে না; আকাট মূর্খ হলেও বোঝে। সেটা তার - বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে, বাপ-ঠাকুরদার মুখে শোনা গল্প থেকে।

তবে এটাও ঠিক - চেষ্টা করলে, সচেতন হলে অনেকটায় ভালো অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়। বিশ্বের অনেক দেশ পেরেছে মৃত নদীকে বাঁচিয়ে তুলতে। সর্ষের মধ্যে ভূত, তাই বোধ হয় ব্যর্থ নদী মাতৃক বঙ্গদেশ। নদী বিজ্ঞানী ও পরিবেশ বিজ্ঞানীরা যে নিদান দিয়েছেন; সেটা অনুসরণ করলে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি রক্ষা পেত। মহানগরের ফুসফুস নষ্ট হয়ে গেছে উন্নয়নের জোয়ারে।

এইসব ভাবনা সম্পদের মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়। তার মতো কিছু মানুষ আছে যারা হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারে না। কিছু মানুষ তো আছেই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবে। সেই তাড়ানোটা কিছুটা হলেও সফল হয়, যদি না স্বার্থান্বেষী কিছু মানুষ সংগঠনে যুক্ত হয় নিজেদের আখের গোছানোর জন্য, সুনাম অর্জনের জন্য, সমাজ সেবকের ছাপ্পা গায়ে লাগিয়ে নেওয়ার জন্য তৎপর হয়। পরিবেশপ্রেমী, সমাজসেবীর অলংকারের জন্য দুই হাতে টাকা খরচ করতেও পিছপা হন না। ছবি চাই, অনেক ছবি। ছয়লাপ হবে সোস্যাল মিডিয়ায়। লাইক, কমেণ্ট এবং ইমোজির ঝড় উঠবে। মিটিং-এ, সেমিনার-এ, পদযাত্রায় যাদের দেখা যায়; তাদের মধ্যে এই আখের গোছানো মানুষদের সংখ্যায় বেশি। তারা নিঃস্বার্থভাবে পরিবেশের জন্য কাজ করতে তো আসেনি। কোন না কোন উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই তারা যুক্ত হয়। পরিবেশের কাজ করতে এসে, কখন যেন পরিবার দূষণ করে ফেলেছে। কিছু দূষণ থাকে, যা শোধন হয় না। তার ফলে - সেই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো মানুষদের নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টা ব্যর্থই হয়। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, অনেকে। না হলে 'সেভ জলঙ্গী' ও 'পরিবেশ বন্ধু'র মতো নদিয়া জেলার বহুসংগঠন বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে আন্দোলন করে আসছে, তেমন সুফল নজরে কি এসেছে? রুটিন মাফিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়। প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ দাবি অনুযায়ী সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দানও করেন। ছবি আপলোড আর সোস্যাল মিডিয়ায় পোষ্ট। সাইকেল র‌্যালি, পথদযাত্রা, অঙ্কন প্রতিযোগিতা, প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা, বৃক্ষরোপন - আরো নানাবিধ কর্মকাণ্ড সারাবছর হচ্ছে। বছর শেষে গাছ লাগানোর ছবি, ছবিতেই থেকে যায়। লাগাতার পরিচর্যায় কিছু চারা বড়ো হয়ে উঠলেও নিরাপদ নয়। মেলা-খেলা-ভোটের দামামা বেজে উঠলে বুলডোজার মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয় - 'একটি গাছ, অনেক প্রাণে'র সম্ভাবনাকে।

সোস্যাল মিডিয়ায় বৃক্ষরোপণ প্রচারের দশ শতাংশও যদি তিন বছর পর আবার ছবিতে জায়গা করে নিতে পারে, তাহলে পরিবেশ কিছুটা হলেও সুস্থ্য হয়ে উঠবে। আগামীতে শিশুদের বাসযোগ্য হয়ে উঠবে এ ধরণী। শুধু এই সংগঠন নয় আরো অনেক সংগঠন আছে, সেই সকল সংগঠন মাথাভাঙা-চূর্ণী, ইছামতী, কলিঙ্গ অঞ্জনা নদী ও খাল-বিল নিয়ে কাজ করছে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার ভাবনা থেকে। বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজাই রাখার দায়বদ্ধতা থেকেই, উন্নয়নের ধ্বজা উড়িয়ে পরিবেশের যে ক্ষতি হয়েছে তার কিছুটা পূরণের উদ্দেশ্যে। নদিয়া জেলায় ভৌমজলের ভাণ্ডার দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে, মিষ্টি জলের সংকটের ভয়ঙ্কর দিন অদূরে নেই। নদিয়ায় ভূগর্ভস্থ মিষ্টি জলের ভাণ্ডার পুষ্ট করার খাল-বিল, নদী-নালা, ছোটোবড়ো জলাশয় যথেষ্ট পরিমাণে থাকলেও, সেই সকল জলাশয় সংরক্ষণের প্রতি প্রশাসন ও নাগরিকদের উদাসিনতায় সবকিছুই ধ্বংস হয়ে গেছে, যাচ্ছে। ধরা যাক অঞ্জনার কথা, যা জেলা শহর কৃষ্ণনগরের মধ্য দিয়ে ৭ কিলোমিটার প্রবাহিত। রবি ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম অঞ্জনা নদী নিয়ে কবিতা লিখেছেন, গান লিখেছেন। শহরের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত এই জলধারা এখন খাল, নালা বা মাছ চাষের ভেড়িতে রূপান্তরিত হয়েছে। এই জলধারার যত্ন নিলে বর্ষার জল অলিগলি, রাজপথ জলমগ্ন হয়ে জনজীবন বিপন্ন হত না। এড়ানো যেত বহু দূর্ঘটনা।

(ক্রমশ)

আলোকচিত্রঃ লেখিকার কাছ থেকে প্রাপ্ত।