ধর্মাধর্ম সমুচ্চয়ম্
।। ১ ।।
দূরের দিকে চোখ যেতেই মনে হল, শতাব্দী প্রাচীন ঘোর অন্ধকার একটি জনপদের মাঝে স্টেশন। পশ্চিম প্রান্তের অন্ধকার ভেদ করে, বোম্বেগামী ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে নামিয়ে দিয়ে, পূর্বের ঘোর অন্ধকারের ভিতর ঠুকে গেল। মনটা বড় বিষন্ন হয়ে উঠল ট্রেনটির এই নির্মমতায়। পৃথিবীখানা যেন বা একটি অচেনা, অজানা গ্রহ। চারিদিকে শুধু অন্ধকারের মধ্যে মিটমিট করছে ক'টি ল্যাম্প পোস্ট। আমার দিকভ্রম হল। আসলে আমরা পূর্ব থেকে যাত্রা করে পশ্চিমে এসেছি।
খান্ডোয়া রেল স্টেশন। রাত তিনটে বেজে কুড়ি মিনিট। প্ল্যাটফর্মে ক'জন ভিখারী গুটিসুটি করে শুয়ে আছে। শীত শীত মনে হচ্ছে। ওরাও আড়ষ্ট মনে হল। চোখে মুখে জল দিয়ে দেখি দু' চার জন যাত্রী ফুট ওভার হয়ে উল্টো দিকে চলে যাচ্ছে। অনুপদা বললেন - "এখন হয়ত কোনও গাড়ি ঘোড়া থাকতে পারে, চলে গেলে হয়।" যেই বলা সেই কাজ। লাগেজ, পোঁটলা ঘাড়ে তুলে হাঁটা দিলাম আমরা ক'জন কৌতুহলী যাত্রী।
স্টেশনের বাইরে একটা বাস দাঁড়িয়ে আছে, ছেড়ে যাব যাব করছে। খালাসী ডাকছে - "আয়য়ে আয়য়ে, ওঙ্কারেশ্বর রোড, আয়য়ে..."
দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে দেখি, বাস একেবারেই ফুল। উঠব কি উঠব না ভাবতে না ভাবতেই দেখি ঠেলাঠেলি করে অসীমদা উঠে পড়েছে বউ ছেলেকে নিয়ে, আমরাও উঠলাম। আমি আর মিতালীদি কেবিনে গিয়ে বসলাম। অনুপদা গেলেন মাঝের দিকে।
নিঝুম শহর ঘুমিয়ে আছে। ঘোমটা পড়া অভিমানী বউটির মত নিশ্চুপ। সকালের সূর্য এসে মান ভাঙিয়ে যাবে। এই শহরে জন্মেছিলেন দুই প্রখ্যাত শিল্পী, দুই ভাই কিশোর কুমার ও অনুপ কুমার। অসংখ্য বাঙালি বাস করে এখানে। তাদের পড়াশোনা, বোলচাল সব স্থানীয় ভাষায়।
শহর পেরিয়ে বাস ছুটে চলেছে হু হু করে, বাইরে মাঠ, তীরের বেগে ছুটে আসছে বাতাস। হাড় হিম করা বাতাস আমাদের ইতিমধ্যে কাঁপুনি ধরিয়ে দিল, তড়িঘড়ি আমার উলের চাদর বের করে কোনও রকম নিজেকে ঢাকলাম। মিতালীদি একটি চাদর বের করলেন ঠিকই কিন্তু বাতাসের দাপটে গায়ে জড়াতে পারলেন না, কোনওক্রমে তিনি নিজেকে আড়াল করে আছেন। চড়াই উৎরাই বেয়ে তীব্র বেগে বাস ছুটছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সনাবাদ পেরিয়ে এগিয়ে চলল বাসটি। এরপর কয়েক কিলোমিটার গিয়ে খালাসী বলল - "মোরটক্কা, উতরো, ওঙ্কারেশ্বর রোড, উতর যাইয়ে।"
আবার আমরা তাড়াহুড়ো করে নেমে পড়লাম। উঠতেও তাড়া, নামতেও তাড়া। জীবনটাই যেন তাড়া খাওয়া জীবন।
এমন স্থানে নামলাম যার বাঁয়ে যেন ঝোপঝাড়, অন্ধকারে কিছু স্পষ্ট হচ্ছে না। সামনে একটা মোড় দেখতে পাচ্ছি। এটাই মোরটক্কা। এখানে আশেপাশেই রেল স্টেশন আছে যার নাম ওঙ্কারেশ্বর রোড।
মিটমিট করে আলো জ্বলছে মোড়ে। একটি ধাবা টাইপ দোকান আছে মনে হল। একটি পুলিশ পোস্টও। কিছু ছোট গাড়ি দাঁড়িয়ে, তারাও চিৎকার করছে - "ওঙ্কারেশ্বর ওঙ্কারেশ্বর..." সেখানেও যাত্রী বোঝাই। অসীমদা বউ বাচ্চা সহ উঠে পড়েছেন আবার। আমরা তিনজন বারবার পিছনে পড়ে যাচ্ছি। অসীমদার সাথে বাসে উঠেছিলাম ফুলতলা মোড়ে, গত তিন দিন আগে শনিবার সকাল দশটা নাগাদ। তারপর সারাদিন ধরে বাসে চড়ে আসানসোল এসেছিলাম। অনুপদা বাসস্ট্যান্ড থেকে নিয়ে গেলেন তার শ্বশুরবাড়ি, মিতালীদির বাবা গৌরীনাথ মুখোপাধ্যায় ভীষণ সজ্জন মানুষ। গল্প করতে ভালবাসেন। মানুষকে আপন করে নিতে বিন্দুমাত্র সময় লাগে না তাঁর। আমার সাথে একাধিকবার তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছে। তিনি অনেক গল্প করেছেন। বিশেষ করে বৃদ্ধ বয়সে মানুষ তার যুবকালের স্মৃতি রোমন্থন করে থাকেন। তিনি মিশনারি স্কুলে পড়াশোনা করেছেন, কথায় কথায় ইংরেজি বলেন। আমাদের যাওয়ার কথা ছিল সুতরাং তিনি জানেন আমি আসছি। বাড়িতে যখন পৌঁছলাম, আমাদের সকলকে দেখে প্রফুল্লিত হলেন। তাঁর মনেও এক অদ্ভুত আবেগ।
অনুপদা গাড়িতে উঠতে ইতস্ততঃ করছেন। আমিও। অসীমদা বলছেন - "উঠে পড়ুন, আমি আর নামছি না।" অগত্যা...
পিছনে চারজন বসে। আর একটি বিড়াল বসারও জায়গা নেই। অনুপদা কোনও রকমে জায়গা করে নিলেন, আর আমি! গাড়ি গড়াতে শুরু করেছে। আমি এই বিদেশ বিভুঁয়ে একা রয়ে যাব! উঠে বসলাম একটা সুটকেসের উপর। ভীষণ কষ্ট।
অন্ধকার ভেদ করে ছুটে চলেছে গাড়ি। রাস্তা দ্রুত বেগে দূরে সরে সরে যায়, দূরের দিকে আঁধার। কিছু চোখে পড়ে না। কতদূর যেতে হবে জানি না, গাড়ি চলছে, মহাশূন্যের অনন্ত গহ্বরে অনন্ত অন্ধকারে ডুবে আছে পৃথিবী, আমরা তারই ভিতর কোনও প্রান্তে আলো খুঁজে চলেছি।
এখন শরৎকাল। শীত আসতে দেরি আছে। ছোটনাগপুরের মালভূমিতে বছরে চারটি ঋতু। ফলত, শরতের প্রভাব কম। বাসের ভিতর যে ঠান্ডা লেগেছিল, তার প্রভাব এখনও আছে তবু মনে হল শরতের আমেজ পাচ্ছি। মনে মনে ভাবছি এমন কি অত্যাশ্চর্য স্থান, কী তার আকর্ষণ যার টানে আমরা ছুটে চলেছি? গাড়ি নেমে যাচ্ছে ঢালু পথ ধরে। ঘন কালো ঝোপের মধ্যে আলো জ্বলছে। একটা দুটো হোটেল রেস্টুরেন্ট দেখতে পাচ্ছি, বন্ধ। একটি বাস স্ট্যান্ড পেরিয়ে গেলাম। কিছু দূর গিয়ে আরেকটা। গাড়ি চলল হুহু করে। এবার আরও কিছু ঘরবাড়ি নজরে এল। জনহীন পথ। আলো জ্বলছে, দিনান্তের পরিশ্রম মুছে ফেলার জন্য গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সভ্যতাবাসী।
মন এক অদ্ভুত উদ্দীপনায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। ঘড়ির কাঁটায় এখন সকাল আমাদের বঙ্গভূমিতে। ছ'টা বাজতে চলেছে। এখানে এখনও অন্ধকার। এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি নিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে আছি। আরও ঢালু রাস্তায় নেমে যাচ্ছে গাড়ি। কোথায় গিয়ে থামবে জানি না। কোথায় নামব জানি না, পথ আমাদের অজানা, শুধু এটুকু বলতে পারি, আমরা চলেছি পরম ব্রহ্মের দিকে। জীবনের সমস্ত দুঃখ বেদনা গ্লানি ভুলে, বিষয় আশয় ভোগ বিলাসিতা ত্যাগ করে যে মহানুভব কৌপিনটুকুও পথে ফেলে এসেছে, যার হারাবার মতো আর কিছু নেই, শরীরটাকে সম্বল করে এগিয়ে চলেছে সম্মুখে। পথ! পথ বলতে কিছু নেই, অন্তহীন যাত্রায় কোনও গন্তব্য নেই, লক্ষ্য একমাত্র ত্রিপুট চক্রের কেন্দ্রস্থল, সেই পরম ব্রহ্ম আমাদের গন্তব্য।
গাড়ি এসে দাঁড়াল একটি আশ্রমের সামনে। গেটে আলো জ্বলছে। অন্ধকার চারপাশ। আশেপাশে দেখি, দূরে কিছু নজরে আসে না। একটি চায়ের দোকান সদ্য খুলছে। প্রভাতসূর্য যতক্ষণ না স্নাত করছে পৃথিবী ততক্ষণ বুঝতে পারছি না কোনটা কোন দিক।
ভব্য আশ্রম। গজানন মহারাজ নামাঙ্কিত। এই মহারাজ রাজ্য শাসন করে না, সাধু সন্ন্যাসীদের মানুষ মহারাজ বলে বলে নিজেদের দাস'এ পরিণত করে ফেলেছে। এদের মহারাজ বলার আরও একটি কারণ - এরা অর্থ ও প্রাচুর্য সহ বিলাসবহুল জীবনযাপন করে থাকে। গেট পার করে গেলে ডাইনে অফিস। বাঁয়ে একটা সুন্দর শৈলীর মন্দির। আমরা অফিসে প্রবেশ করলাম।
দুই সন্ন্যাসী গোছের যুবক ঢুলছিল। তাদের জাগালাম। ঘর চাই।
- "কাঁহা সে হো আপলোগ?"
- "বেঙ্গল সে।" অনুপদা উত্তর দিলেন।
- "দিখাইয়ে, আধার কার্ড দিখাইয়ে।"
আধার ও ভোটার কার্ড বের করলেন অনুপদা। কিন্তু আমি তো কিছুই নিই নি! দেখা যাক। বৈশাখীদেরগুলো চাওয়া হল। যুবক দুজন কার্ডগুলো উল্টেপাল্টে ভালো করে দেখল, তারপর বলল,
- "আপলোগকো ঘর নেহি মিলেগা।"
- "কিউ নেহি মিলেগা?" অনুপদার চোখে জিজ্ঞাসা!
- "লেডিস লোগ কোন হেয়! উনকো অলগ সে কামরা লেনা হোগা।"
- "কেন অলগ কমরা লেনা হোগা? হামারা ওয়াইফ হে। দোনো কা।"
- "ক্যায়সে? আপকা নাম ক্যা! অনুপ কুমার চট্টোপাধ্যায়। উনকি নাম মিতালী মুখোপাধ্যায়। ক্যায়সে হোগা! ইসকা দেখুঁ তো ভী ঠিক নেহি, আসীম কুমার দাস ঔর বৈশাখী দত্ত। ক্যায়সে চলেগা?"
বড্ড ঝামেলা। অনুপদা বলছেন - "এখন হাম কাঁহা জায়েগা? ড্রাইভার এধার ছোড় কে চলা গিয়া।"
আমাকে বলতে হল। বললাম - "আপ এ্যাইসা করে, দো অলগ অলগ কামরা বুক করে, এক আদমী কি নামসে ঔর দুসরা লেডিস কি নাম সে।"
ঝঞ্ঝাট মিটল। দুটি রুম পাওয়া গেল ২২০/২২১।
রাতটা যেন অন্ধকার বিদিশার নিশা। ফুরাতে চাইছে না। ৭ই অক্টোবর ২০১৭, শনিবার সকালে উঠেছি বাড়ি থেকে। আসানসোল স্টেশনে রাত একটার সময় ট্রেনে। ভোর পাঁচটা নাগাদ বুদ্ধগয়া। সারাদিন উত্তরপ্রদেশের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে দেখেছি বিহড় দেহাতের শূন্য প্রান্তর। তারই মাঝে খাঁ খাঁ মাঠের মধ্যদিয়ে কলসী মাথায় করে জল নিয়ে যাচ্ছে কোনও দেহাতি মহিলা। বড় জলকষ্ট এই রুক্ষ ভূমিতে। কতদূর থেকে আনতে হচ্ছে আর কতদূর যেতে হবে সেই জানে।
লন পেরিয়ে দোতলায় ঘর। জামাকাপড় বদলে পা-হাত ধুয়ে বিছানায় এলিয়ে পড়লাম। অবসন্ন শরীরে ঝুপ করে নেমে এলো ঘুম।
ঘুম যখন ভাঙল সকাল আটটা। বাথরুমে ঢোকার হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। মিতালীদি বললেন - "তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও, ওঙ্কারেশ্বর মন্দিরে পুজো দিতে যেতে হবে।" কথাটা ভাবতেই শরীরে শিহরণ খেলে গেল। এই স্থানের গল্প পড়েছি এক বাঙালির ভ্রমণবৃত্তান্তে। নাম শৈলেন্দ্র নারায়ণ ঘোষাল। নর্মদা তটে পরিক্রমা করার সময় এখানে ছিলেন একমাস।
আবেগ বিজড়িত স্থান। মান্ধাতা পুত্র মুচকুন্দের দূর্গপ্রাচীর ঘেরা রাজধানী মাহিষ্মতী। দুদিক দিয়ে প্রখর বেগে বয়ে চলেছে নর্মদা নদী। বিপদসঙ্কুল বনজঙ্গল ঘেরা। তারই মাঝে একটি দ্বীপভূমি।
কাহিনী পৌরাণিক হলেও গল্প মন্দ নয়। মান্ধাতা হলেন ইক্ষুবাকু বংশের শাসক। পিতা ২য় যুবনাশ্বের জঙ্ঘা ভেদ করে তার জন্ম হলে সন্তান কি করে জীবনধারণ করবে তাঁর মনে এই চিন্তা উদয় হল। দেবরাজ ইন্দ্র তখন নিজের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ চুষিয়ে বললেন, "মামধাতা মামধাতা।" অর্থাৎ আমি-ই তাকে পোষণ করব। মান্ধাতা এই দ্বীপে এসে একটি শিবলিঙ্গ স্থাপন করেন। পরে তাঁর পুত্র মুচকুন্দের রাজধানী মাহিষ্মতী রূপে এটি খ্যাত হয়।
ভারতবর্ষের প্রান্তে প্রান্তে শত শত তীর্থস্থান, যেখানে মানুষ যতটা পুণ্য লাভ করে তার অধিক অর্থ ব্যয় করে আসে। সংসার ক্লেশ থেকে সাময়িক পরিত্রাণ লাভ করে সন্তোষ প্রকাশ করে। অপরদিকে তীর্থগুলির মাহাত্ম্য প্রচার ও ব্যাখান করার পিছনে একটাই যুক্তি কাজ করে, তা হল সেসব তীর্থস্থলীর অর্থসমৃদ্ধি ঘটানো। যেকোনো তীর্থস্থান মূলরূপে বানিজ্যিক স্থান, কপটস্থান, ঠগস্থান। একথা এক বাক্যে স্বীকার করতে হবে। একথা মাথায় রেখে চাণক্য বলেছেন -
"সাধুনাং দর্শনাং পুণ্যং
তীর্থভূতাহি সাধবাঃ।
কালে ন ফলেতে তীর্থঃ
সদ্য সাধু সমাগমাঃ।।"
অর্থাৎ শত শত তীর্থ দর্শনের চেয়ে একজন প্রকৃত সাধু দর্শনে বহু পুণ্য লাভ হয়ে থাকে। এবার প্রকৃত সাধু খুঁজে বেড়াও। কোথায় তারা? রাজ দরবারে, টিভির পর্দায়, মহামন্ডলের গদীতে! কোথায়?
প্রকৃত সাধু আড়ালেই থাকেন। অন্য একটি শ্লোকে তিনি বলেছেন -
"ন দেব বিদ্যতে কাষ্ঠে, ন পাষাণে, ন মৃন্ময়ে।
ভাবে হি বিদ্যতে দেবস্তমাদ্ভাবো হি কারণম্।।"
অর্থাৎ দেবতা কাঠে বা পাথরে বা মাটির মূর্তিতে নেই, ভাবের গভীরে ঈশ্বর নিরাকার শক্তিরূপে বিদ্যমান। তাঁর হাত নেই, পা নেই, দৃষ্টি নেই, কানও নেই। ঈশ্বরের চলন গমন শ্রবণ কিছু নেই। ভাব থেকে উদ্ভব স্বভাবের। স্বভাব থেকে জগতের। মানে পদার্থের। এই পদার্থ থেকে জীব ও জড় জগৎ সৃষ্ট। অনু-পরমাণুর চঞ্চলতা হল চৈতন্য। হাত-পাওয়ালা কোনো ঈশ্বর বাস্তবতার জগতে নেই। তবু ধর্ম নিয়ে মানুষের উন্মাদনা দিন দিন বেড়ে চলেছে। এটি মানুষের অদৃশ্য লেজ। এই লেজটি যতদিন না খসে পড়ছে ততদিন মানুষ, মানুষ হতে পারবে না।
ধর্মের নামে হিংসা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার প্রবণতা একটা পাগলামী। শান্তির আশায় বুদ্ধ রাজ্যসুখ ত্যাগ করেছিলেন। এমনকি কার্তিক অমাবস্যায় যখন বুদ্ধ রাজধানী ফিরে আসেন, তাঁর আগমনে রাজ্যজুড়ে দীপদান করা হয়েছিল। জলে স্থলে জ্বলেছিল আলো। তখন গৌতম পুত্র রাহুল রাজসুখ নয়, অন্তরাত্মার নির্মলতা কামনা করেন। বুদ্ধ আশীর্বাদ করে বলেন - "আত্তদিপ ভব"।
গজানন আশ্রম থেকে বেরিয়ে এলাম। ভোরবেলায় যে চায়ের দোকান খুলতে দেখেছিলাম, সেখানে চা খাওয়া হল, এদিক ওদিক চেয়ে দেখি কি নির্মল প্রকৃতি! কি শান্ত, কি নীরব, কোলাহল নেই, কোলাহলের সময় নয় এটা। চারিদিকে উঁচু উঁচু পাহাড়। বড় বড় গাছ।
অনুপদা দু' কাপ চা খেলেন। তিনি পাশে থাকলে কাউকে কোনোকিছু নিয়ে ভাবতে হয় না। অগ্রদূতের মতো তিনি সব দায়িত্ব নিজে থেকেই মাথায় তুলে নেন।
শরতের শিরশিরে বাতাস গায়ে লাগছে। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ল যোগ সাধনায় ধ্যানের তূরীয় অবস্থায় শরতের শীতল বাতাস গায়ে লাগে। শীত বা গ্রীষ্ম যে ঋতুই চলুক ধ্যানগম্ভীর শরীরের ভিতরে না বাহিরে কোথায় যে এই বায়ু মধুর প্রলেপ দেয় তা অনুমান করা মুশকিল কিন্তু যোগীর জীবনে এই বাতাস একটি তাৎপর্য বয়ে আনে।
মৃদুমন্দ বাতাস গায়ে লাগিয়ে আমরা এগিয়ে চলি গন্তব্যের দিকে। পথের ডানদিকে পরিক্রমাবাসীদের আখড়া। পঞ্চায়েতি আখড়া, শ্রীনিরঞ্জনী আখড়া। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই নামের অনেকগুলো আখড়া আছে। নর্মদা নদীকে পরিক্রমা করে হাজার হাজার সাধু। নর্দমার পরিক্রমা মাহাত্ম্য প্রচার করে গেছেন ঋষি মার্কণ্ডেয়। অমরকণ্টক থেকে পাহাড় কন্দর গ্রাম শহর দুর্গম বন প্রান্তর অতিক্রম করে জব্বলপুরের পাশ দিয়ে বয়ে এসেছে এই নদী।
জব্বলপুরে পরিক্রমাবাসীদের বিশ্রামস্থল রয়েছে। ভীড়াঘাটে। সরস্বতী ঘাটে আরতিস্থল। সন্ত শিরোমণি গুরু রবিদাসজীর আশ্রম ও মন্দির ঘাটের ধারে। এদের মাঝে আছে মার্বেল রকস। পূর্ণিমার রাতে এক অদ্ভুত মোহলোক তৈরি করে পর্যটকদের তা আকর্ষিত করে। তবু সেসব ছেড়ে আমরা এসে হাজির মান্ধাতা দর্শনে।
ডাইনে গাড়ি পার্কিং জোন। তার নীচে শান্ত শুষ্ক প্রবাহিনী নর্মদা। আমি থমকে গেলাম। যাকে দর্শনমাত্র জন্মার্জিত পাপ ক্ষয় হয়। সামনে পিছনে পাহাড় টিলা।
"দেবনামতি কৌন্তেয়! তথা রাজ্ঞং সলোকতাম্।
বৈদুর্যপর্বতম্ দৃষ্টবা নর্মদামবতীর্থম চ।।
সন্ধিরেষ নরোশ্রেষ্ঠ! ত্রেতায়া দ্বাপরস্য চ।
এতমাসাদ্য কৌন্তেয়! সর্বপাপেঃ প্রমুচ্চ্যতে।।"
"হে কুন্তীপুত্র, ওই যে সামনে দেখছ বৈদুর্য পর্বত দেখা যায়, ওখানে নর্মদা নদীতে স্নান করলে দেবলোক ও রাজলোক প্রাপ্ত হওয়া যায়। ত্রেতা ও দ্বাপর যুগের সন্ধিক্ষণে এই পর্বত উত্থিত হয়। এই স্থানে মানুষ আগমন করলে সর্বপ্রকার পাপ হতে মুক্তি লাভ করে।"
মহাভারতের বনপর্বে ব্যাসদেব লোমশ মুনির মুখ দিয়ে কথাগুলো বলেছেন। যদিও এর ঐতিহাসিক দিকও আছে।
প্রকৃতির কোলে অনেক আশ্চর্য দ্বীপ খণ্ড থাকলেও সম্মুখের ওই দ্বীপটিকেই বলা হয়েছে বৈদুর্য পর্বত। নর্মদা নদীর দুটি ধারার মাঝে একে পরশুরাম মহেন্দ্র পর্বতও বলেছেন।
দ্বীপের দিকে এগিয়ে চলেছি। আমরা ঝুলন্ত সেতুর উপর হাঁটছি। এটি ব্রহ্মপুরীর সাথে দ্বীপকে যুক্ত করেছে। পশ্চিমে বিষ্ণুপুরীর সাথে যুক্ত সেতু কংক্রিটের। সেতুর হাজার ফিট নিচে নদীতে জল নামমাত্র। বঙ্গদেশে নদীবক্ষে যেমন চর পড়ে তেমনটা নয়, এখানে নদীগর্ভে পাথরের চট্টান। ফাঁকে ফাঁকে জল। পূর্ব প্রান্তে কয়েক শ মিটার দূরে ড্যাম। সব জল আটকে আছে ওখানে। আমাদের সবাই ওপারের কাছাকাছি চলে গেছে, আমি কেবল মাঝখানে দাঁড়িয়ে নর্মদার এ তট ও তট অবলোকন করছি। নদী তল থেকে অনেক উঁচু দুই পাড়। এপারে সারি সারি হোটেল, দোকান, ওপারে ওঙ্কারেশ্বর মন্দির। ওরা আমাকে ডাকাডাকি করছে। বৈশাখী ম্যাডাম হাসাহাসি করছে। আমি কি দেখছি, দেখার মতো কি দৃশ্য আছে ওর বোধগম্য হচ্ছে না।
কিন্তু আমি দেখেছি - পূর্বে ড্যাম। একটি সরু জলরেখা উপর থেকে নিচে পড়ছে যেন বা কোনও দুষ্টু শিশু দুষ্টুমি করে দাঁড়িয়ে হিসু করছে। পশ্চিমে নদী সরু হয়ে হারিয়ে গেছে উঁচু উঁচু দুই পাহাড়ের আড়ালে। নদীবক্ষে জল কই? শুধু চট্টান আর চট্টান। ফাঁকে ফাঁকে জলের গভীরতা আন্দাজ করা কঠিন। আসলে এই ফাঁকগুলো পাহাড়ের ফাটল।
এই সেতুটির নাম NHDC মামলেশ্বর সেতু। উত্তর দিকে মান্ধাতা দ্বীপের সাথে যুক্ত হয় পূর্ব-পশ্চিমে চলে গেছে, তা মূলত নদীর উপর দিয়েই দক্ষিণ প্রান্তে ব্রহ্মপুরী থেকে দেখলে তা অনেকটা T আকৃতি বিশিষ্ট দেখায়।

ঝুলন্ত মামলেশ্বর সেতু

নর্মদা নদী ও ব্রহ্ম ঘাট
নদীর কিনারায় ওঙ্কারেশ্বর মহাদেব বিরাজমান। প্রস্তরশৈলীতে নির্মিত গম্বুজাকার মন্দিরের চূড়া দেখা যায় দূর থেকেই। নাটমন্দিরে বিশালাকার থাম বড় বড় গ্রানাইট ব্লক দিয়ে নির্মিত দেবগৃহ।

গর্ভগৃহে পুজোসামগ্রী সহ প্রবেশ করলাম। শিবলিঙ্গ গোলাপ ফুলের পাপড়িতে ঢাকা। পুরুষ দেবতাকে সাদা ফুল দেওয়া প্রথা। এ তো সম্পূর্ণ গোলাপী।

ওঁকারেশ্বর মন্দির
আজ ২২শে আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ। সন - ৯ই অক্টোবর ২০১৭, সোমবার। আজ ওঙ্কারকে ভজনা করব। সৃষ্টির আদিতে উচ্চারিত ওঁ-ধ্বনি এখানে আকার রূপে স্থিত। নভোমন্ডল ব্যাপিত ওঁ যোগী পুরুষের সর্বাঙ্গ দিয়ে যখন প্রকাশিত হয় তখন যোগী পুরুষ বাহ্যজ্ঞান লোপ পেয়ে অন্তর্জ্ঞানে জেগে ওঠেন। তখন জল স্থল বায়ু জড় অজড় শব্দ গন্ধ মাত্রা বর্ণ শূন্য - সব এক হয়ে যায়। তখন শুধু একটাই সত্তা 'অহম'। এই অহম শব্দই ওঁ আকারে বিধৃত। অহম ব্রহ্মাস্মী। আমিই ব্রহ্ম। একমেবদ্বিতীয়ম। এই অবস্থায় উন্নীত হবার জন্য সাধুরা কঠোর সাধনা আর কিছু ভ্রান্ত পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। এভাবে কেউবা জীবনপাত করে, কেউ কুটিরের এককোণে গোপনে স্বয়ংসিদ্ধ হয়ে যায়, বাইরের মানুষ টের পর্যন্ত পায় না।

ওঁকারেশ্বর মহাদেব
পূজারী জলের ঘট এগিয়ে দিলেন, বললেন - "পুজা বাহর মে করনেকা ইন্তেজাম হ্যায়। আপলোগ সির্ফ জল অর্পণ কিজিয়ে।"
আমরা এক এক করে জল অর্পণ করলাম। করজোড়ে প্রণাম করলাম -
ওঁ ত্রম্বকম জজামহে সুগন্ধীং পুষ্টিবর্ধনং
ঊর্বারুকমিব বন্ধনাৎ মৃত্যুর্মুক্ষিয়মামৃতাৎ।।
আরও উচ্চারণ করলাম -
"ওঁ সর্বায় ক্ষিতিমূর্তয়ে নম। ভবায় জলমূর্তয়ে নম। রুদ্রায় অগ্নীমূর্তয়ে নম। উগ্রায় বায়ুমূর্তয়ে নম। ভীমায় আকাশমূর্তয়ে নম। পশুপতয়ে যজমানমূর্তয়ে নম। মহাদেবায় সোমমূর্তয়ে নম। ঈশানায় সূর্যমূর্তয়ে নম। ওঁ"
বাইরে এসে মিতালীদি বললেন - "শিবলিঙ্গের গা চুঁইয়ে জল পড়ছে দেখেছ?"
- "কই না তো!"
- "দেখনি! চলো দেখবে চলো" বলে আমাকে টেনে নিয়ে গেলেন। অবশ্য তিনি আমাকে দেখাবার জন্যই বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে দু' তিন দিনের যাত্রা করে এতদূর নিয়ে এসেছেন। ওঙ্কারেশ্বর আসা আমার ইচ্ছে আর সেই ইচ্ছেকে সফল করতে সমস্ত ব্যয়ভার বহন করে তিনি আমাকে মহাদেবের চরনতলে হাজির করেছেন। আমি নাস্তিক বলে নয়, উনি জানেন আমার কোথায় কোনটা কতটা প্রয়োজন। অনুপদাও ততটাই জানেন।
পুরোহিত বারবার শুকনো কাপড় দিয়ে জল মুছে দেখালেন। নর্মদার জল শিবলিঙ্গ চুঁইয়ে পড়ছে, এটা কি করে সম্ভব! নর্মদা নদী মন্দির থেকে অনেক নীচে। দু' তিনশো ফুট উপরে নদীর জল উঠে আসবে কোন নিয়মে? অবশ্যই পাহাড়ের জলের চুয়ানো।
গৃহকোণে অখণ্ড জ্যোতি জ্বলছে। কোন সাধু কোন মন্ত্রবলে দীপ প্রজ্বলন করে গেছেন কেউ জানে না। সিঁড়ি বেয়ে নীচে কোটিতীর্থ ঘাট। বিশ বছর আগেও যোগাযোগ মাধ্যম ছিল নৌকা। এই ঘাটে স্নান করলে আর পুনর্জন্ম হয় না। ইহজন্মে দেবলোক ও রাজলোক প্রাপ্ত হওয়া যায়।
দ্বাদশ শিবলিঙ্গের মধ্যে চতুর্থতম ওঁকারেশ্বর। ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যযুক্ত লিঙ্গের মধ্যে বাহান্নতম। বারোটির মধ্যে চারটি অতি গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলি কেদারনাথ বদ্রিনাথ সোমনাথ ও বিশ্বনাথ। কেন এগুলো এত খ্যাত হল! এটা ভাবার কথা। আসলে এগুলোর মধ্যে তিনটিই অতীতকালে বৌদ্ধস্থল ছিল। কাশি ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পীঠস্থান রূপে পরিগণিত হয়। খ্রীষ্টপূর্ব জাতককথায় দশরথের বাস ছিল কাশি বেনারস। রাম তাঁর ভাই, বোন ও সীতা সহ হিমালয়ের বনে গিয়ে বাস করতে থাকেন। সেই বেনারস। ফলত, বাকি তীর্থস্থানগুলো অবহেলিত হয়ে পড়ে। শিবলিঙ্গের চুরাশিটি প্রকারভেদ আছে। শিব যদি একজন হয়, তবে চুরাশি প্রকার কিভাবে হয়? মানুষ বহুমুখী স্বভাবের। তাই কী? মনে করিয়ে দেয় সম্রাট অশোক চুরাশি হাজার বৌদ্ধ স্তূপ নির্মাণ করান। কোনো যোগসূত্র কি আছে?
যাইহোক, আমাদের ভক্তির একটি আলাদা কারণ আছে। সে প্রসঙ্গে এখন আসব না। বিশ্বাস ও মান্যতা নিয়ে গড়ে ওঠা ভক্তি থেকে তীর্থস্থান ও শিবলিঙ্গের সৃষ্টি। পৌরাণিক দেবদেবীরা আসে মূলত রাজা রবি বর্মা (১৮৪৮-১৯০৬)-র হাত ধরে। দেবতার চিত্র কেমন হবে, সেটা রবি বর্মা করে দেখিয়েছেন। তিনি একজন অনুভবী চিত্রকর ছিলেন। পতিতার প্রতিকৃতি দেখে ছবি আঁকতেন। আঁকার জন্য শরীর উন্মোচন করা সেই সময়ে সাধারণ নারীর কাছে কোনও ভাবেই সহজ ছিল না। তাঁর আঁকার হাত ধরেই ভারতীয় দেবীদের আগমন। অপরদিকে গৌতম বুদ্ধের হাত ধরে বিষ্ণুর আগমন। মাঝখানে শিবলিঙ্গ কোথা থেকে এল? অশোক পিলারগুলো ঘষে মেজে শিবলিঙ্গের রূপ দেওয়া হয়েছে। আবির্ভূত হল লিঙ্গদেবতা। তাকেই শিবরূপে পুজো করা হয়। এর আগে কখনও মূর্তি পুজো হয় নি।
মান্যতানুসারে সাধারণ শিবলিঙ্গ ও জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে একটি পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্য কারা তৈরি করেছে, জানার চেয়ে পার্থক্য কি সেটা জানা দরকার। সাধারণ শিবলিঙ্গ মনুষ্য নির্মিত আর জ্যোতির্লিঙ্গ স্বয়ং প্রকটিত। স্বয়ং উদ্ভূত। স্বয়ংভূ।
পৌরাণিক গল্পটা চমৎকার। সৃষ্টির প্রাক্কালে পৌরাণিক দুই দেবতার বিবাদ বাধে। শ্রেষ্ঠ কে? ব্রহ্মা নাকি বিষ্ণু! কাকে কেন্দ্র করে জগৎ সংসার আবর্তিত! বিবাদ যখন চরমে, তখন উভয়ের মাঝখানে একটা অদ্ভুত জ্যোতির আবির্ভাব ঘটে। সেই জ্যোতির ছটায় দুই দেবতার চোখ ধাঁধিয়ে যায়। দুই দেবতা বিহ্বল হয়ে জ্যোতির দিকে তাকিয়ে থাকেন। সেই জ্যোতির মধ্যে ধীরে ধীরে প্রকট হলেন মহাদেব।
দেবদ্বয় ভয়ে বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলেন - আপনি কে?
'শয়ম্ভূ', তোমরা মিছে বিবাদ করছ। সমাধান খুব সহজ। তোমাদের মধ্যে যে আমার 'আদি' এবং 'অন্ত' খুঁজে দিতে পারবে, সেই হবে বড়। দুজনেই বেড়িয়ে পড়লেন, অবশেষে তাঁরা কেহই আদি অন্ত খুঁজে না পেয়ে ফিরে এসে জ্যোতির বন্দনা শুরু করলেন।
"যদন্তঃস্থানি ভূতানি যতঃসধংপ্রবর্ততে।
যদান্থস্তৎপরাং তত্ত্বং স রুদ্রস্ত্বেক এব হি।।"
(ঋক)
"ভূতগণ যাঁর অন্তরে অবস্থিত, যাঁ হতে সমস্ত উৎপন্ন এবং মহাত্মাগণ যাঁকে পরম বলে থাকেন সেই রুদ্রই একমাত্র পরম তত্ত্ব।"
পঞ্চভূত হল ক্ষিতি অপ তেজ মরুৎ ব্যোম। মাটি জল তাপ বায়ু ও আকাশ তত্ত্ব।
"সেনেদং ভ্রাম্যতে বিশ্বং যোগির্ভিযো বিচিন্ততে।
যদ্ভাসা ভাসতে বিশ্বং স একস্ত্র্যম্বযকঃ পরঃ।।"
(সাম)
"যিনি এই বিশ্বকে পরিচালনা করছেন, যোগীগণ কর্তৃক বিচিন্তিত যিনি, এবং যাঁর দীপ্তিতে বিশ্ব প্রকাশ পাচ্ছে, সেই ত্র্যাম্বকই একমাত্র পরম তত্ত্ব।"
এখানে দেখা যায়, 'বেদ' ছিল শ্রুতি রূপে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে। ধীরে ধীরে সেগুলো সংকলিত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে সংগৃহীত হয়েছে। 'ঋক' শ্লোকগুলো সম্পূর্ণ আর্যদের সৃষ্টি একথা বিশ্বাস করতে দ্বিধা আছে। তাই যদি হবে তবে 'ঋগ্বেদ' তৎকালীন ইরানে লেখা হতো। কেননা 'ঋক'-এর ভাষা সংস্কৃত। আর আর্যরা ইরান থেকে এসেছে। ইরানে কখনোই সংস্কৃত ভাষা ব্যবহার হয় নি। যেভাবে তুর্কদের ভাষা ইরানীয় ভাষার সাথে মিলে উর্দু ভাষার সৃষ্টি, তাও আবার ভারতের উত্তরপ্রদেশে, একইভাবে প্রাকৃত ভাষার সাথে মিলে ভারতে সংস্কৃত ভাষা গঠিত হয়েছে। 'বেদ'-এর দেবতা বিশেষত সকলেই পুরুষ। অরুণ! বরুন! ইন্দ্র! অগ্নি!
ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর কালী দুর্গা তাতে নেই। কেন নেই? সেকথা আগেই বলেছি।
দুর্গাপুজোর প্রথম আয়োজন করা হয়েছিল অষ্টাদশ শতকে। সিরাজ উদ্ দৌল্লাকে পরাজিত করে একটি মোচ্ছব করেছিল কলকাতার জমিদার (রাজা) কৃষ্ণচন্দ্র দেব ১৭৫৭ সালে। সেটাই প্রথম দুর্গাপুজো। প্রগতিশীল যুক্তিবাদী দার্শনিক ই. ভি. পেরিয়ার রামাস্বামীকেই বিশ্বকর্মার রূপ দেওয়া হয়েছিল, হাওড়া ব্রিজ বানানোর সময় সেই কর্মীদের দিয়েই প্রথম বিশ্বকর্মা পুজো হয়।
আবার ফুলের আন্দোলনকে দমন করতে শুরু হয় গণপতি উৎসব। পুণেতে প্রথম উৎসব করেন বাল গঙ্গাধর তিলক, ১৮৯৩ সালে। RSS-এর উদ্যোগে নাগপুর শহরে প্রথম রাবণ দহন উৎসব হয় ১৯৫২ সালে। রাবণ প্রসঙ্গে বললে, শ্রীলঙ্কায় তার কোনও আর্কিওলজিক্যাল এভিডেন্স নেই। সেখানকার নাগরিক ওই নামে কাউকে চেনে না। ভারতীয়দের আবেগকে পর্যটনের আকর্ষণ রূপে গড়ে তুলতে ওখানকার সরকার একটি কৃত্রিম পর্যটন স্থল গড়ে তুলেছে রাবণ স্মরণে।
একথা গ্রহণযোগ্য নয় যে কোনও ব্যক্তি দশটি মাথা নিয়ে চলাফেরা করতে পারে। এর রহস্য অবশ্য ভিন্ন সেকথা পরে বলব। 'গীতা' এখন হিন্দু সমাজের মূলগ্রন্থ। যদিও ব্রাহ্মণ সমাজের কাছে 'বেদ' প্রথম এবং শেষ কথা। সেই 'গীতা' প্রথম লেখা হয়েছে ১৭৮৫ সালে। গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হোস্টিংসের আগ্রহে, টাইপিস্ট চার্লস উইলকিন্স-এর হাতে বারাণসীর জনৈক ব্রাহ্মণ কালীনাথের সাহায্যে, লেখা হয় "Dialogues of Krishna and Arjuna" এটাই 'ভাগবত গীতা'।
নাট মন্দিরের নিচে একটা চাতাল। চাতালের অনেক নিচে চট্টানের ফাঁকে ফাঁকে নর্মদা বহমান। একজন পূজারি এগিয়ে এলেন, এ লোক সে লোক নয়, যে ঝুলন্ত সেতুর উপর পিছু নিয়েছিল। বোঝা গেল সে ছিল দালাল।
স্ফটিক লিঙ্গে পুজো হল। যাগযজ্ঞ করে দশ মিনিটে পুজো শেষ। দক্ষিণা দেবার সময় অনুপদার সাথে বচসা হয়ে গেল। আগেই বলেছি পুরোহিতগিরি লোক ঠকানো ব্যবসামাত্র। আমরা আত্মতুষ্টির জন্য নিজেকেই ঠকাই।

আমি অভিভূত। বাড়ি থেকে হাজার মাইল পথ পেরিয়ে এসেছি মনের আবেগে। যাঁকে ধ্যান করি, যাঁকে ধারণা করি, যাঁর সাধনা করি, তাঁর স্বরূপ বাহ্য প্রকৃতিতে অমিল। তবু, মানুষ কিভাবে রচনা করেছে সেই স্বরূপকে জানার জন্য কল্পরূপকেও জানা চাই।
ওঁঙ্কার মহাদেবের অবস্থান নর্মদা নদীর দুটি ধারার মাঝে একটা দ্বীপখণ্ডের দক্ষিণে। উত্তর ধারার নাম কাবেরী নদী। যদিও কাবেরী নদী দক্ষিণ ভারতের মহীশূর রাজ্যের ভিতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলেছে। এই কাবেরী নর্মদা হতে উৎপন্ন হয়ে নর্মদাতেই মিলে যায়।
ওঁঙ্কারেশ্বর মন্দিরটি নদীর তীরে। শিবলিঙ্গ ওঁ-আকৃতির।
বিঃ দ্রঃ - ঐতিহাসিক তথ্যের পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা বা সত্যতা ও প্রামাণিকতা লেখক দাবি করেন না। পাঠক নিজ বিচারবুদ্ধি ও যুক্তিবলে তা বিচার করবেন এবং উক্ত তথ্য গ্রহণ করা বা না করা তাঁদের নিজস্ব ব্যাপার।
আলোকচিত্রঃ লেখকের কাছ থেকে প্রাপ্ত।
