রীনা পরিবারে পরিচিতজন ও বন্ধুদের কাছে এবং অফিসেও বেশ হাসিখুশি মিশুকে। ওর প্লিজেন্ট পার্সোনালিটি সবাইকে আকৃষ্ট করে। সুপ্রতিষ্ঠিত সরল মনের মেয়েটির বুদ্ধি কিন্তু ক্ষুরধার। বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রবণতা এবং প্রচন্ড মানবিক বোধসম্পন্ন হওয়ায় সবার পছন্দের তালিকায় থাকে ও। রীনা যেমন বেশ জমিয়ে আড্ডা মারে তেমন কাজের ক্ষেত্রেও খুবই দায়িত্বশীল। তাই পঞ্চাশ উর্ধ্বে উঠেও অল্পবয়সীরা ওর বন্ধু হয়ে ওঠে। অফিসের পিওন থেকে টপ বস সকলেই রীনাকে বেশ পছন্দ করে। একদিন অফিসে না আসলেই কাজের প্রয়োজন ছাড়াও অনেকেই ওর খোঁজ নেয়। রীনা অফিসে নিজের ডেস্কে বসেই কাজ শুরুর আগে সকলকে একটা করে চকোলেট দেয়। নিজেও খায়।
ওর নিজের সুগার নেই কিন্তু ওর বয়সী কলিগদের বেশিরভাগ সুগার পেশেন্ট, তাই নতুন আসা কন্ট্রাকচুয়াল স্টাফেরা খুশি হয়ে ওর টফি নেয়।
আজ অন্য সেকশন থেকে ট্রান্সফার নিয়ে আসা নতুন স্টাফ প্রদীপ্তকে টফি দিতে গেলে ও ইয়ার্কির ছলে হাসতে হাসতে বলে উঠল - "আজ কি আপনার জন্মদিন?"
কথাটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছুই না, তবু রীনার বুকের ক্ষতে যেন চাবুকের ঘা পড়ল। ঘুষি পাকিয়ে সত্যিই মারতে ইচ্ছে করছিল প্রদীপ্তকে। হাতটা উঠেও গেল, অতিকষ্টে মুখে হাসি এনে বলল - "একটা পাঞ্চ মারব, ইয়ার্কি হচ্ছে?'
ক্লাস নাইনের লাজুক মুখচোরা রীণা ছিল সচ্ছল যৌথ বাড়ির কন্যা। ব্যবসায়ী পরিবারে রীনার অন্যান্য কাকা জেঠুরা বড়লোক ছিলেন। টিমটিম করে চলা ব্যবসায় তার অসুস্থ বাবা বেণীমাধববাবুর আর্থিক সচ্ছলতা ছিল নিম্নবিত্ত পর্যায়ভুক্ত। তাই চাইলেও সেই পুরোনো দিনে সপ্তাহে পাঁচদিন বাড়িতে পড়াতে আসা প্রাইভেট টিউটরের বলা ভালো মাষ্টারমশাইয়ের কপালে এক কাপ চা ছাড়া আর কিছুই জুটতো না।
কখনো সখনো জুটতো গোটা দুই বিস্কুট। ভাঙা বিস্কুটের দাম কম থাকায় রীনাদের নিজেদের খাওয়ার জন্য ঘরে সেই বিস্কুট মজুত থাকতো, যা মাষ্টারমশাইকে দেওয়া চলেনা। অল্প বেতনে পড়ানো পেটুক মাষ্টার তারিণীবাবু ছিলেন রাজ্য সরকারী কর্মী। অফিস শেষে তিনি প্রথম আসতেন রীনাকে পড়াতে। তারপর যেতেন পাশের পাড়ায় রীনার বন্ধু দীপাকে পড়াতে। বড়লোক দীপাদের বাড়িতে প্রতিদিন চা-এর সঙ্গে ভালো ভালো জলখাবার দেওয়া হতো। আগেরদিন দীপাদের বাড়িতে কি কি খেয়ে এসেছেন সেই গল্প ফলাও করে বলতেন রীনার কাছে। রীণা নিজের পিতার আর্থিক সামর্থ্য বুঝত। তাই এসব শুনে মনে মনে লজ্জায় অপমানে কুঁকড়ে থাকত। প্রতিদিন অপমান সহ্য করতে না পেরে একদিন মায়ের কাছে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেছিল,
- "বিস্কুট না থাক মাষ্টারমশাইকে একটা কিছু বানিয়ে দিতে পারো তো মা? যৌথ সংসারের রান্নাঘরের সন্ধ্যার জলখাবারে নিমকি সুজি এসব তো হয়!"
- "না রে মা সে হয় না। তোর মেজো জেঠিমা সেদিন ফুট কাটছিল তোর রাঙাদাদার তবলার মাষ্টারকে তোর ফুলকাকীমা মাছের পুর দেওয়া দুটো সিঙাড়া দিয়েছিল। সেই নিয়ে কত কথা শোনালো। বলেছে যার যার মাষ্টারকে খাওয়াবার ইচ্ছে হবে সে নিজের খরচে খাওয়াতে পারে, যৌথ ভাঁড়ারে যেন হাত না পড়ে। আমি ওসব ছোটো কথা শুনতে পারবো না রে মা। তোর বাবাকে দুটো হাঁসের ডিম এনে দিতে বলব। কাল ডিম ভাজা করে দেবোখন।"
সেদিন গরম ডিমের মোটা ওমলেটের প্লেটটা নামিয়ে মা ঘরের বাইরে যেতেই তারিণী মাষ্টার বলে ওঠে, "রীণা, আজ কি তোমার জন্মদিন? হঠাৎ এতো আয়োজন?"
উত্তর দিতে পারেনি রীণা। দু'ধারে মাথা নেড়ে না বুঝিয়েছিল। তার পিতার অক্ষমতাকে কেউ কি এইভাবে বিদ্রুপ করতে পারে? অপমানে দাঁতে দাঁত টিপে ধরতেই চোখ ভেসে গেল জলে। বাবা অথবা মা কারুর সঙ্গে একথা শেয়ার করতে পারেনি সেদিন। মা'কে শুধু বলেছিল,
- "স্যারকে আর কোনোদিন ওমলেট করে দিওনা। স্যারের ডিম খেলে এলার্জি হয়।"
- "তবে যে খেয়ে নিলেন সবটুকু?" বিস্মিত মায়ের প্রশ্নের সামনে রীণা আরও একটা মিথ্যা বলে দিল,
- "স্যার তো ডিমটা আমাকেই খেতে দিলেন।"
কতোদিন আগের কথা এইসব। আজ জীবন সায়াহ্নে এসে একইসঙ্গে আরও একটা তৃপ্তির ছবি ভেসে উঠছিল। মাধ্যমিকের পরে ওই মাষ্টারমশাই আর পড়াননি রীণাকে। কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। রীণা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডী পেরিয়ে নিজ যোগ্যতায় সরকারী চাকরী পেয়েছে। উচ্চশিক্ষিত সুপ্রতিষ্ঠিত স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে দ্বিরাগমনে বাপের বাড়ি বেড়াতে এসেছে। সদ্য বাজারে আসা নতুন ফোর্ড আইকন গাড়িতে চড়ে বরকে বাপের-বড়িতে শালা-শালিদের জিম্মায় বসিয়ে রেখে বাবাকে নিয়ে পাশের পাড়ার বিখ্যাত মিষ্টির দোকানে মিষ্টি কিনতে এসেছে।
গাড়ি থেকে নেমে মিষ্টি দেখতে ব্যস্ত রীণা খেয়ালই করেনি তারিণী মাষ্টারমশাইকে। তার বাবা দেখালো,
- "ওই দ্যাখ তোর মাষ্টার মিষ্টি না নিয়েই চলে যাচ্ছে।"
- "সেকি গো কেন?"
- "কেন কে জানে, তোকে আমাকে দেখেছে অবশ্য। কিন্তু মুখ ঘুরিয়ে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে চলে গেল। তোদের লাল গাড়িটার দিকে কিন্তু বার বার তাকাচ্ছিল।"
রীণা কোনোদিন অহংকারকে প্রশ্রয় দেয়নি। কিন্তু আজ মনে হয় তারিণী মাষ্টার সেদিন তার প্রাচুর্য সহ্য করতে পারেননি। তাই বোধহয় পালিয়ে বেঁচেছিলেন।
সেদিনে জন্মদিন প্রসঙ্গ তুলে মাষ্টারশাইয়ের রীণাকে অপমানের মু-তোড় জবাব; যেন ঈশ্বর নিজেই প্রস্তুত করে রেখেছিলেন।
