সম্পাদকীয়

আমরা বাঙালি। আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা বাংলা। আমাদের মাতৃভূমি পশ্চিমবঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য। প্রশ্ন হচ্ছে একটাই, আমরা তো পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি, আমরা কী ভারতীয়? আর যদি ভারতীয় হই, আমরা কেমন ভারতীয়?

অন্য রাজ্যে গিয়ে কর্মস্থলে বাংলাভাষায় কথা বললে, বিশেষকরে বিজেপি শাসিত রাজ্যে সরাসরি শারীরিক আক্রমণ করা হচ্ছে, লুটপাট হচ্ছে, বাসস্থান থেকে জোর করে উৎখাত করা হচ্ছে বাংলাদেশী তকমা দিয়ে। এমনকি গেরুয়া রাজ্য সরকারের প্ররোচনায় সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হচ্ছে মূলত যাদের জন্মস্থান পশ্চিমবঙ্গ, যাদের মাতৃভাষা বাংলা। মাথা মোটা গুজুভাইদের কে বোঝাবে, "বাংলাভাষী মানে বাংলাদেশী নয়।"

জবরদস্তি করে অন্য দেশে পাঠালে যে পরিনতি হয়, বাংলাদেশে গিয়ে তাদের একই পরিনতি হয়েছে। অসহায়, বিপন্ন মানুষগুলোকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। তাদের কী অপরাধ? একমাত্র অপরাধ তারা বাংলাভাষায় কথা বলে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কতটুকু ক্ষমতা? সীমিত ক্ষমতায় রাজ্য সরকার মানবিক দায়িত্ব পালন করে নিরীহ পরিবারের সদস্যদের রাজ্যে ফিরিয়ে আনছে।

ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার ৭৮ বছর পরেও কর্মস্থলে বাংলাভাষায় কথা বললে হিন্দু, মুসলিম নির্বিশেষে যদি এই পরিনতি হয়, তবে তো প্রশ্ন উঠবেই, বাঙালি কী এই স্বাধীনতা চেয়েছিল?

বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের কমবেশি একই অভিজ্ঞতা। পক্ষান্তরে পশ্চিমবঙ্গে বিশেষকরে কোলকাতা মহানগরীতে অবাঙালি পরিযায়ী ও স্থায়ী শ্রমিকদের এতোটাই একাধিপত্য যে বাঙালি আজ সেখানে সংখ্যালঘু। একই চিত্র দেখা যাবে আসানসোল, রাণীগঞ্জ, বার্ণপুর, কুলটিতে। দার্জিলিঙের কথা বাদ দেওয়াই ভালো, মাঝে মাঝে মনে হয় ওটা রাজ্যের বাইরে।

দেশের স্বাধীনতায় বাঙালির অবদান অবিসংবাদিত, অবিস্মরণীয়। দেশের স্বাধীনতার জন্য ফাঁসির মঞ্চে যাঁরা জীবনদান করেছেন, তাঁদের শতকরা ৯০ ভাগ বাঙালি। দীর্ঘদিন যাঁরা কারান্তরালে ছিলেন, তাঁদের ৯৫ ভাগ ছিলেন বাঙালি। ১৯৭২ সালে দেশের স্বাধীনতার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী প্রথমে ঠিক করেছিলেন, দেশের স্বাধীনতার জন্য যাঁরা ১০ বছর জেল খেটেছেন, তাঁদের তাম্রপত্র ও স্বাধীনতা সংগ্রামী পেনশন দেওয়া হবে। দেখা গেল সবাই বাঙালি। তখন ঠিক করলেন, যাঁরা পাঁচ বছর জেল খেটেছেন, তাঁদের দেওয়া হবে। সেখানেও দেখা গেল সবাই বাঙালি। তারপর ঠিক হলো, ছয় মাস জেল খাটলে স্বাধীনতা সংগ্রামী পেনশন দেওয়া হবে। কিছু পাঞ্জাব ও অন্য প্রদেশের পাওয়া গেল। অবাঙালিদের ক্ষেত্রে এমনকি একদিন জেল খাটলেও স্বাধীনতা সংগ্রামী পেনশন দেওয়া হয়েছিল। এই তো ছিল বাঙালি ও অন্য প্রদেশের মানুষের মধ্যে স্বাধীনতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষায় তীব্র ফারাক। ইতিহাস স্বাক্ষী, সময় স্বাক্ষী, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস আজাদ হিন্দ বাহিনী তৈরি করে ইংরেজদের আক্রমণ না করলে, এতো সহজে ইংরেজ এ দেশ ছেড়ে চলে যেতো না আর ভারতবর্ষ এতো তাড়াতাড়ি স্বাধীনতাও অর্জন করতে পারত না। এরজন্য কঠিন মূল্য দিতে হয়েছে দুটি জাতিকে বাঙালি ও পাঞ্জাবী। তাদের দ্বিখণ্ডিত করে সৃষ্টি হলো পাকিস্তান। প্রতিনিয়ত আজও তার মূল্য চোকাতে‌ হচ্ছে। বাঙালি হলে বাংলাদেশি, পাঞ্জাবী হলে খালিস্থানি।

স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালির ভূমিকার বাইরে বাংলাভাষা ও সাহিত্যে বাঙালির অবদান অনন্য। অখন্ড ভারতে প্রথম নোবেল পুরস্কার এনে দেশের গৌরব বৃদ্ধি করেছিল রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের কাব্যগ্রন্থ 'গীতাঞ্জলি'। ভারতের জাতীয় সংগীত বাংলায় রচনা। বন্দে মাতরম সঙ্গীতের রচনা করেছেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। জনপ্রিয়তম ঔপন্যাসিকের নাম শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। জয়হিন্দ স্লোগানের উদ্গাতা নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। প্রিয় এই ভাষায় কথা বললে ভারতের অন্য প্রান্তে যদি বাঙালিরা অপমানিত হয়, আতংকিত হয়, আক্রান্ত হয়, তবে বাঙালিকে নতুন করে আরেকবার নবজাগরণের পরীক্ষা দিতে হবে এবং সেই পরীক্ষায় অবশ্যই সাফল্যের সঙ্গে তাকে উত্তীর্ণ হতে হবে।

বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে আসন্ন নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের বুকে বিভেদের গুজুসংস্কৃতিকে চিরতরে বিনাশ করাই হবে, বাঙালির সাফল্যের প্রথম ধাপ।


১৫ মার্চ, ২০২৬